রবিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কীসে নারায়ণগঞ্জের সম্মানহানি হয়!

সোমবার, ২৪ মে ২০২১, ২১:০৫

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

মো. ফখরুল ইসলাম: নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী সাংসদ শামীম ওসমান বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সম্মান ক্ষুন্ন হয় এমন নিউজ যাতে না হয়। যদি কোনো ভুল হয়, জানালে সমস্যার সমাধান হবে। আর নিউজ হলে সম্মান কমবে। নারায়ণগঞ্জের সম্মান কমলে সবার সম্মান কমবে।’

জাতীয় কলসেন্টারের ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চেয়ে উল্টো জরিমানার শিকার আলোচিত ফরিদ আহমদের ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে সাংসদ এই কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সম্মান বাড়াতে হবে। ছোট করা যাবে না। কিছু কিছু পত্রিকা এমনভাবে নিউজ করে যেটাতে নারায়ণগঞ্জের সম্মান নষ্ট হয়।’

সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠবে কী এমন সংবাদ বা নিউজ যে কারণে সাংসদ এমন কথা বললেন। কোন নিউজে নারায়ণগঞ্জের সম্মান নষ্ট হয়? জানা যায়, গত ১৮ মে জাতীয় কলসেন্টার ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চান সাংসদ শামীম ওসমানের সংসদীয় এলাকার কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নাগবাড়ির বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ ফরিদ আহমদ খান। পরে ২০ মে ওই এলাকায় গিয়ে সদর ইউএনও আরিফা জহুরা ফরিদ আহমদকে উল্টো শাস্তিস্বরূপ ১০০ প্যাকেট খাদ্য সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন। খাদ্য না দিলে তাকে তিন মাসের জেলা দেওয়া হবে বলেন ইউএনও। সেদিনই স্থানীয় অনলাইন সংবাদ মাধ্যম প্রেস নারায়ণগঞ্জ ও পরের দিন জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে সংবাদ প্রকাশি হয় ‘খাদ্য সহায়তা চেয়ে জরিমানা!’, ‘৩৩৩ তে ফোন করে খাদ্য চাইলেন চারতলা বাড়িওয়ালা, জরিমানা’, ‘খাদ্য চেয়ে ৩৩৩-তে ভবন মালিকের ফোন, জরিমানা ১০০ জনকে খাওয়ানো’, ‘খাদ্য সহায়তা চেয়ে ৩৩৩-এ ফোন করে ফাঁসলেন বাড়ির মালিক’ শিরোনামে।

সেই সংবাদে ইউএনও আরিফা জহুরার বরাতে লেখা হয়, ‘একজন ব্যক্তি ৩৩৩ নাম্বারে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চান। বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে সরেজমিনে হাজির হয়ে দেখা যায়, তিনি নিজেই একটি চারতলা ভবনের মালিক। নিছক দুষ্টুমির ছলে ওই বাড়ির মালিক ফোন করেছেন। বিভ্রান্ত করায় তাকে ১০০ প্যাকেট খাদ্য সহায়তা প্রদান করতে বলা হয়েছে।’

১০০ জনকে খাদ্য সামগ্রী দেওয়ার মতো সামর্থ্য না থাকলেও জেলে যাওয়ার ভয়ে নিজের স্ত্রী ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর গয়না বিক্রি ও ধার-দেনা করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ করে এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন ফরিদ আহমদ। এমনকি স্থানীয় ইউপি সদস্য আইয়ুব আলীর থেকেও ধার নিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। এমনকি আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন ফরিদ। এই ঘটনা জানা যায়, খাদ্যসামগ্রী বিতরণের দিন ২২ মে। ওইদিন প্রেক্ষাপট ঘুরে যায়। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভিন্ন গল্প।

জানা যায়, জরিমানার শিকার সেই ‘চারতলা ভবনের মালিক’ ফরিদ আহমদ আসলে ভবনের সাত অংশীদারের একজন। তিনি মাত্র তিনটি কক্ষের মালিক। ঘরে তার ১৬ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী ছেলে, স্নাতক পড়ুয়া মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছে। এক সময় স্থানীয় এক হোসিয়ারি কারখানায় কাটিং মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। তিনবার ব্রেন স্ট্রোক করার পর ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ফরিদ এখন কাজ করতে পারেন না। ওই কারখানাতেই শ্রমিকদের উপর নজরদারি রাখা বাবদ মাসে ৮ হাজার টাকা পান তিনি। তাতে কষ্টেসৃষ্টে চলছিল তার সংসার। তবে করোনাকালীন সময়ে পড়েছেন মহাসংকটে। একরকম নিরুপায় হয়েই জাতীয় কলসেন্টারের ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চান ফরিদ। কিন্তু সহায়তা তো পাননি, উল্টো তিনি চারতলা ভবনের মালিক এমন তথ্যের কারণে জরিমানা গুণতে হয়েছে।

এবার স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে ‘সরকারি সহায়তা চেয়ে উল্টো জরিমানা গুনলেন বৃদ্ধ ফরিদ’, ‘সরকারি খাদ্য সহায়তা চেয়ে গুনলেন জরিমানা’, ‘৩৩৩ এ ফোন করা সেই ‘৪ তলার মালিকে’র হৃদয় বিদারক ঘটনা’ এমন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলো।

কিন্তু কথা হল কীসে সম্মানহানি হয় নারায়ণগঞ্জের? সাংসদ শামীম ওসমানের নিজ সংসদীয় আসনের ভোটারের ত্রাণ সহায়তা চেয়ে জাতীয় কলসেন্টারে ফোন, সেই নাগরিককে প্রকাশ্যে এনে হয়রানি ও তাঁর সম্মানহানি করা নাকি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব গাফলতির সংবাদ প্রকাশ?

যদিও সাংসদ শামীম ওসমান বলেছেন, ‘আমি পত্র-পত্রিকায় দেখলাম, সদর উপজেলার একটি ঘটনায় বিভিন্নভাবে নিউজ করা হয়েছে। এই নিউজ করা ঠিক আছে। কিন্তু নিউজ করার আগে দেখতে হবে যে, আমাদের সম্মান বাড়লো নাকি কমলো। কোনটা সঠিক তথ্য সেটা জেনে ইউএনওকে বললেই তো হয়। এখানে ইউএনওকে খাটো করা মানে উপজেলা পরিষদকে খাটো করা।’

সাংসদের বক্তব্য অনুযায়ী সংবাদ প্রকাশে ইউএনওকে খাটো করা মানে যদি উপজেলা পরিষদকে খাটো করা হয়, তবে কর্মকর্তার দায়িত্বে গাফলতির কারণে ইমেজ সঙ্কটে পড়া প্রশাসনের দায় কে নিবেন? কিংবা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের নাকি আমলাতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিবেন? এই প্রশ্ন রইলো জনগণের কাছেই। তবে সাংসদ শামীম ওসমানের ভাষ্যমতে নারায়ণগঞ্জের সম্মানহানি কতটুকু হলো না হলো সেই প্রশ্ন থাকলেও ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ ফরিদ আহমদ খানের সম্মানহানি ও হয়রানির বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।

লেখক: সম্পাদক, প্রেস নারায়ণগঞ্জ

সব খবর