বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর, ২০২১

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি কার স্বার্থে?

মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর ২০২১, ১৩:১৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

বিমল কান্তি দাস: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করায় জনজীবনে একটা গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সরকার না করলেও পারতো। তাহলে কার স্বার্থে মূল্য বৃদ্ধি করা হলো? ভারতে জ্বালানি তেলের মূল্য সম্প্রতি কমানো হয়েছে। তেলের উপর আমদানি ট্যাকস কমিয়ে ভারত সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য না কমালেও অন্তত বৃদ্ধি না করা উচিৎ ছিল। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তে দেশ ও জনগণের বড় ধরনের সর্বনাশ হয়ে যাবে।

যুক্তি দেখানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে তাই নাকি বাংলাদেশেও বৃদ্ধি করতে হোল। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হলেই অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যবৃদ্ধি করতেই হবে এমন কোন কথা নেই। মূল্য বৃদ্ধি যেমন হয়েছে কয়েকদিন যাবৎ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমতেও শুরু করেছে। পৃথিবীর সকল দেশেই জনস্বার্থে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দেবার প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন খাতে বিশেষ বিশেষ সময়ে সকল দেশেই সরকার ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির যুক্তিকে সামনে আনা হচ্ছে শুধুমাত্র কৈফিয়ত দেবার জন্য। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়তে শুরু করেছে অতি সম্প্রতি। কিন্তু এর আগে বছরের পর বছর ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমেছে। মূল্য কমতে কমতে প্রায় অর্ধেকের নচে নেমে এসেছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন মূল্য কমেছিল তখনো বেশ কয়েকবার সরকার দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছিল। তখন মূল্যবৃদ্ধির কি যুক্তি ছিল? বামপন্থীরা তখনো তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে, আন্দোলন করেছে।

ইরাকে সাদ্দাম সরকারের পতনের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমতে শুরু করে এবং দীর্ঘ অনেক বছর যাবত মূল্য কমই ছিল। এর পেছনে আমেরিকা-ব্রিটেন ও ধনী রাষ্ট্রগুলোর একটা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল। ইরাকের সাদ্দাম, লিবিয়ার গাদ্দাফি ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ক্ষমতাসীন সরকার তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করত। বিশেষ করে লিবিয়ার গাদ্দাফি, ইরাকের সাদ্দাম সরকারের উপর জ্বালানি তেলের মূল্য কমানোর জন্য মার্কিন প্রশাসনের চাপ ছিল। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি আমেরিকার সেই চাপ অগ্রাহ্য করায় আমেরিকা তাদের সরকার উচ্ছেদ করেছে এবং দুই দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন দিতে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি সরকার উৎখাতের মধ্য দিয়ে তেলের আন্তর্জাতিক বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নেয়। ওই সময়কালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে অল্প মূল্যে জ্বালানি তেল ক্রয় করে স্টক করার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য একেবারেই কমিয়ে দেওয়া হয়। এগুলো ছিল আমেরিকার ষড়যন্ত্রমূলক বাণিজ্যনীতির একটা বিষয়। তখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামী রাষ্ট্রগুলো যারা তেলের বাজার বেশকিছুটা নিয়ন্ত্রণ করত তাদের হাত থেকে এখন পৃথিবীর পুরো তেলের বাজার আমেরিকাসহ কয়েকটি ধনী দেশের হাতে এসে গেছে। জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার পর এখন বিশ্ববাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে কিন্তু এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। তখন তারা তেল ক্রয় করেছে, স্টক করেছে। এই জ্বালানি তেলের দখল নিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে আমেরিকা গণহত্যা করেছে, অনেকগুলো সরকারক উচ্ছেদ করেছে। মিথ্যা মিথ্যা দোষ চাপিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ উত্থাপন করেছে। ঐ গণহত্যা ও যুদ্ধগুলোকে তারা বলতো সন্ত্রাসবিরোধী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এগুলো ছিল আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার দখল নিয়ে যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হয়েছে আর অন্যদিকে ইরাক, লিবিয়াসহ অনেকগুলো দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন দিয়েছে। এর সবকিছুই ছিল আন্তর্জাতিক বাজার দখলের যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ।

কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করায় দেশে জনগণের মধ্যে যে হতাশা ও অরাজকতা নেমে এসেছে, মানুষের জীবনে যে দুঃখ দুর্দশা বেড়েছে তার জন্য দায়ী কে? জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে বাস মালিকরা ধর্মঘট ডাকলেন। যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি করতে সরকারকে বাধ্য করলেন। এই নাটক দেখে যে কোনো কম বুঝের মানুষও বুঝবে এই বাস মালিকদের সাথে সরকারের একটা যোগসাজশ ছিল। বোঝা গেল সরকার, রাষ্ট্র ও লুটেরা মালিকদের একটা যৌথ পরিকল্পনার ভিত্তিতে তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আপাতত যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধির সমস্যাটাই দেশবাসীর চোখে বেশি আসছে কিন্তু এখানেই শেষ নয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষি, শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে উৎপাদনেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। বাজার সিন্ডিকেটগুলো এই সুযোগে সকল নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করবে। দেশে একটা দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি হবে। এটা `মরার ওপর খাড়ার ঘা` ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগেই বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য যে পরিমাণে বৃদ্ধি হয়েছিল তাতেই মানুষের নাভিশ্বাস উঠে আছে। এরপর আবার যখন দ্রব্যমূল্য বাড়বে তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

অনেক বছর যাবত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কম থাকায় সরকার বিদেশ থেকে তেল আমদানি করে জনগণের কাছ থেকে অনেক বর্ধিত মূল্য সঞ্চয় করেছে। অনেক বেশি পরিমাণ টাকা জনগণের কাছ থেকে লাভ করেছে। পরিসংখ্যান ঠিক কত তা বলতে পারবো না, আনুমানিক পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার বেশি হবার কথা। তখন আমরা বামপন্থীরা বহুবার তেলের মূল্য কমানোর দাবি তুলেছিলাম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল; যে বর্ধিত মূল্য রাখা হচ্ছে তা মানুষের পেছনেই ব্যয় করা হবে। এমনও বলা হয়েছিল পরবর্তীতে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়লে তখন এই সঞ্চিত অর্থ সমন্বয় করে তেলের বাজারে মূল্য ঠিক রাখা যাবে। কিন্তু সরকার কোন কথাই রাখেনি। ভারত সরকার আমদানিকৃত তেলের উপর ট্যাক্স কমিয়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের মূল্য কমিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইচ্ছা করলে তেল আমদানির ওপর ট্যাক্স কমিয়ে তেলের মূল্য কমিয়ে রাখতে পারতো, কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটলো না। আগে জনগণের কাছে থেকে নেয়া সঞ্চিত বর্ধিত মূল্য সমন্বয় করেও তেলের মূল্য ঠিক রাখতে পারতো। সরকার কেন উল্টো পথে হাটলো?

অন্যদিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে তেলের মূল্য বৃদ্ধির সুযোগে যানবাহনের মালিকরা একটা লুটপাট শুরু করেছে। ইচ্ছামাফিক ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে এই লুটেরা পুঁজিপতি গোষ্ঠীকে মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই এবং ১৮ কোটি মানুষের পকেট কেটে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হয়েছে। তেলের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে ততটুকু তার চেয়ে শতভাগ বেশি যানবাহনে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

সরকার যে লুটেরা পুঁজিপতি গোষ্ঠীর সরকার তার একটা জলজ্যান্ত প্রমাণ দিয়েছে তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে। এই সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা অত্যন্ত অন্যায় কাজ হয়েছে। দুই বছর ধরে করোনা কালে দেশের শ্রমজীবী মানুষ সর্বশান্ত হয়ে আছে। দারিদ্র সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা পূর্বের চেয়ে শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ তার জীবন জীবিকা নিয়ে হতাশ এবং দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় দিন যাপন করছে। এমন সময়ে আরেকবার যখন দেশের সকল নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, যানবাহনের ভাড়া বাড়বে, তখন দেশের শ্রমজীবী মানুষের কি পরিণতি হবে? সরকার কি এই পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র বিবেচনা করলো না? এভাবে দেশের জনগণকে বিপদে ফেলে লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করা কি একান্তই প্রয়োজন হোল?

পরিসংখ্যানে জানাযায় করোনাকালেও কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে, তাদের ধন-সম্পদ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে এই লুটেরাদের আরও সম্পদ বৃদ্ধি হবে, সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ সর্বসান্ত হবে। সরকার যে লুটেরাদের পক্ষে এবং লুটপাটের অর্থনীতিকেই পাহারা দিচ্ছে; জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সেই প্রমাণ পরিস্কার করেছে। অন্যদিকে বলা যায় সরকার যে শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান করে তার প্রমানও এর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

দেশে গণতন্ত্র সংকোচন করা হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচন করা হচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে প্রহসন করা হচ্ছে, সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, `জোর যার মুল্লুক তার` এই ধরনের একটা মধ্যযুগীয় সংস্কৃতি ও স্বৈরতান্ত্রিক সংস্কৃতি সমাজে চেপে বসেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে লুটপাটেরও দৌরাত্ম্য আরো অস্বাভাবিকহারে বেড়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর আমরা পার করছি। বড় দুঃখ হয়, আজ হারিয়ে যাচ্ছে সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। প্রকৃতপক্ষে মুক্তযুদ্ধের সমস্ত অর্জন শেষ করে ফেলা হচ্ছে। পাকিস্তানের ২২ পরিবার এতটা লুটপাট করেনি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরাও এত লুটপাট করেনি; আজ যা চলছে তা একেবারেই স্বৈরতান্ত্রিক।

জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে এখনো বর্ধিত তেলের মূল্য প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। যানবাহনের (সকল প্রকার) বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লে আন্দোলনে সফল হবো। বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করতে সরকার বাধ্য হবে।

পরিস্থিতি দেখে মনে হতে পারে জনগণ সবকিছু সহ্য করে নিচ্ছে; আসলে তা নয়। কেউ যদি মনে করেন জনগণকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে; তারাও ভুল ভাবছেন। জনগণের বুকে ঘৃণার আগুন জ্বলছে, হয়তো সরকার তা তোয়াক্কা করছে না। এর পরিণাম অবশ্যই ভোগ করতে হবে এদের।

সরকার ও রাষ্ট্র যতটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তাতে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক শুন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে। শুধুমাত্র শ্রমজীবী মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, গোটা দেশ, জাতি ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে এই মাত্রাহীন লুটপাট ভয়ঙ্কর পরিনতি ডেকে আনবে।

লেখক: বিমল কান্তি দাস, কমিউনিস্ট পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য।

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ