বুধবার ২১ অক্টোবর, ২০২০

না’গঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ১ মাস: কান্না থামেনি হতাহত পরিবারগুলোর

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২০, ২১:৫৮

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

সৌরভ হোসেন সিয়াম (প্রেস নারায়ণগঞ্জ): টানাপোড়েনের সংসারে কলেজপড়ুয়া ছেলে রিফাতকে নিয়ে আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখতেন বেসরকারি একটি স্কুলে আয়ার কাজ করা রিনা আক্তার। পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটি চাকরি নিয়ে সংসারের হাল ধরার কথা প্রায়সময়ই মা মঞ্জু বেগমকে বলতো সদ্য এসএসসি পাস করা সিফাত। স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সাড়ে ছয় বছরের ছেলে জুনায়েতকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন ছিল পোশাক শ্রমিক রাহিমা বেগমের। এমনই অনেক স্বপ্ন ছিল সহোদর সাব্বির, জুবায়ের, জুনায়েদ, মনির, ইমরান, আজিজসহ আরও কয়েকটি পরিবারের। গত ৪ সেপ্টেম্বর মসজিদে ভয়াবহ সেই বিস্ফোরণে শেষ হয়ে গেছে তাদের সকল স্বপ্ন আশা ভরসা।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ সেই বিস্ফোরণের ঘটনার এক মাস পূর্ণ হলো। তবে কান্না থামেনি হতাহত পরিবারগুলোর। বিস্ফোরণে কেবল প্রিয়জনই নয় পুড়েছে তাদের স্বপ্নগুলোও। এক বুক হতাশা আর চাপা কান্না নিয়ে দিন পার করছেন তারা। প্রিয়জনের স্মৃতিই এখন একমাত্র সঙ্গি। তল্লার গলিগুলোতে এখনও ঝুলছে হতাহত মানুষগুলোর ছবি সম্বলিত শোক সংবাদের ব্যানার।

১৬ বছর বয়সে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী থানার বাহেরচর গ্রামের রাহিমা বেগমের (২৫) বিয়ে হয় একই গ্রামের জুলহাস ফরাজীর (৩০) সাথে। বিয়ের তিন বছরের মাথায় ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় জুনায়েত। ছেলেকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন দেখতেন মা রাহিমা। মসজিদে বিস্ফোরণে পুড়ে গেছে তার স্বপ্ন। ভয়াবহ সেই বিস্ফোরণে ছেলের সাথে হারিয়েছেন স্বামীকেও।

শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পশ্চিম তল্লা এলাকায় ভাড়াবাড়িতে বসে গৃহস্থালি কাজ করছিলেন রাহিমা বেগম। দুর্ঘটনার পর থেকে চাকরিতে যান না পোশাক শ্রমিক এই নারী। স্বামী ও ছেলের কথা তুলতেই অঝোরে কিছুক্ষন কাঁদলেন রাহিমা। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, ওই রাতে ব্যথায় কাতরাইতাছিল দুইজনই। আমি বাবুর পাশে বইসা ছিলাম। হাসপাতালে বাবু কানতাছিল। কইছি ‘আম্মু কাইন্দো না, ঘুমাও। মায় তোমার পাশে দাড়াইয়া আছি।’ আমার কথা শুইনা চুপ হইয়া গেল। এইযে চুপ হইলো আর আম্মু বইলা ডাকলো না। পরদিন বিকেলে লাশ দেশের বাড়িতে নেওয়ার সময় মাওয়া ফেরি পার হইছি আর শুনি আমার স্বামীও নাই। দুইজন আমারে একলা থুইয়া গেল গা। আমার আর কেউ রইলো না।

পাশেই বসে কাঁদছিলেন রাহিমা বেগমের শ্বাশুড়ি সালেহা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার একটামাত্র ছেলেই আছিল। ঘরে বাতি দেওয়ার কেউ নাই। নাতিডা বাঁইচা থাকলেও বুঝতাম পোলায় আছে। নাতিডাও নাই। এত এত টাকা দিয়া কী করমু। টাকা দিয়া কী পোলা হারানোর সুখ পামু?’

এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর নারায়ণগঞ্জের কদম রসুল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল শাহাদাত হোসেন সিফাত (১৯)। ১৪ সেপ্টেম্বর ভর্তির শেষ সময় চলে যাওয়াতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা স্বপন মিয়ার কাছে জানতে চেয়েছিলেন ‘আব্বু ভর্তির ডেট তো শ্যাষ’। কলেজে কথা হয়েছে যেকোনো সময় ভর্তি করানো যাবে বলে সান্ত¦না দিয়েছিলেন বাবা। ভর্তি হওয়া হয়নি সিফাতের। ঘটনার ১৭ দিন পর গত ২২ সেপ্টেম্বর সকালে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে।

সিফাতের মা মঞ্জু বেগম বলেন, আমার পোলায় তো বেশি পোড়ে নাই। বাইচা যাইবো বইলাই ভাবছিলাম। মঙ্গলবার সকালে শুনি পোলায় আর নাই। পড়াশোনা কইরা অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল পোলায়। সব স্বপ্ন শ্যাষ। আল্লায় আমার গোলাপ ফুলডা কাইড়া নিলো!

স্বপ্ন পুড়েছে রিনা আক্তারেরও। শহরের ডনচেম্বার এলাকার ফিলোসোফিয়া স্কুলে আয়ার কাজ করতেন রিনা আক্তার। কলেজপড়–য়া ছেলের মায়ের আয়ার কাজ করতে দিতে চাইতেন না। এসএসসি পাশ করার পর থেকে টিউশনি করেই নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতো রিফাত। সংসারেও টাকা দিতো সে। টানাপোড়েনের সংসারে কলেজপড়–য়া ছেলে রিফাতকে নিয়ে আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখতেন রিনা আক্তার। ছেলেকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় তিনি। ছেলের কথা উঠলেই তার কান্না কেউ থামাতে পারেন না।

গতকাল পশ্চিম তল্লা এলাকায় টিনশেডের ভাড়া বাড়ির সামনে কথা হয় রিনা আক্তারের সাথে। ছেলের প্রসঙ্গ তুলতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘বুয়ার কাজ কইরা কয়টা টাকা কামাইতাম। পোলায় এইটা পছন্দ করতো না। সবসময় কইতো মাগো, আমি তোমারে কষ্টে রাখমু না। সব ঠিক কইরা দিমু। আমরা ফ্ল্যাটে উঠমু।’

ছেলের ব্যবহার করা ব্যাগ দেখিয়ে বলেন, ব্যাগটার বিভিন্ন জায়গায় ছিড়ে গেছে। তারপরও নতুন ব্যাগ কিনে নাই। এইটা লইয়াই কলেজে যাইতো। প্যান্ট ছিড়ে গেলে তা রিফু কইরা পড়তো। আমার ছেলের মতো এই তল্লায় আর কেউ নাই।

রিফাতের রিকশাচালক পিতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জন্মের পরের থেইকাই কষ্ট দেখতাছে। আমার একার ইনকামে সংসার চলে না দেইখা পোলায় নিজে টিউশনি কইরা পড়ালেখার খরচ জোগাইতো। করোনায় টিউশনি না থাকায় একটা হোসিয়ারিতে চাকরি নিছিল। আমার খুঁটির জোর আছিল পোলায়। আমার খুঁটির জোর শ্যাষ।’

যেভাবে ঘটেছিল ভয়াবহ বিস্ফোরণ

শুক্রবার দিন পেরিয়ে রাতে স্বাভাবিকভাবেই এশার নামাজের ফরজ আদায় করেছিলেন পশ্চিম তল্লা এলাকার মুসুল্লিরা। ফরজ শেষে অনেকে বেরিয়ে গেলেও বাকিরা সুন্নাত ও নফল নামাজ আদায়ের জন্য ছিলেন মসজিদে। রাত পৌনে নয়টার দিকে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহুর্তেই মৃত্যুকূপে পরিণত হয় মসজিদটি। গুরুতর দগ্ধ ৩৭ জনকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। সেখানে মারা যান মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ ৩৪ জন।

এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, তিতাস, ডিপিডিসি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মসজিদের পাশেই তিতাস গ্যাস লাইনে লিকেজ ছিল। সেই লিকেজ থেকে দীর্ঘদিন যাবত মসজিদের ভেতর গ্যাস জমা হচ্ছিল। মসজিদ কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়াতে দরজা জানালা সব বন্ধ ছিল। গ্যাস বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। ঘটনার দিন বৈদ্যুতিক স্পার্ক থেকে উৎসারিত আগুন ও জমা হওয়া গ্যাস থেকেই ঘটে ভয়াবহ এই বিস্ফোরণ। মসজিদে দু’টি বৈদ্যুতিক লাইনের একটি অবৈধ ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তিতাস গ্যাস কোম্পানি ফতুল্লা জোনের ৪ প্রকৌশলীসহ আটজনকে গ্রেফতার করে। পরে স্থানীয় এক বিদ্যুৎ মিস্ত্রিকেও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার প্রত্যেককেই রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। বিস্ফোরণের ঘটনার পর থেকে এক মাস যাবত মসজিদটি বন্ধ রয়েছে। গত এক মাসে এই মসজিদে আজান কিংবা নামাজ কিছুই হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর অনুদান চেক পায়নি মামুনের পরিবার

হতাহত ৩৫ পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে চেক হস্তান্তর করা হয়। তবে ৫ লাখ টাকার চেক পাননি বলে জানান বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ মামুন (২৩)। শনিবার মামুন জানান, তার চেকটি এসেছে তার মৃত বাবা লতিফ প্রধানের নামে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনে জানালে একটি দরখাস্ত করতে বলা হয়। দরখাস্ত গত ২৮ সেপ্টেম্বর জমা দিয়েছেন বলে জানান মামুনের স্ত্রী রুবি।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামীম বেপারী বলেন, মামুনের বাবা মৃত এ বিষয়টি তখন জানানো হয়নি। ফলে বাবার নামে চেক এসেছে। পরে নাম পরিবর্তন করার জন্য দরখাস্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। রোববারের মধ্যে মামুন চেকটি পাবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ