বুধবার ২৮ অক্টোবর, ২০২০

নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন ও একজন মমতাজ বেগম

বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:৫৮

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল এক ইতিহাস। সে ইতিহাসে সবচেয়ে অগ্রগামী নামটি হলো- ভাষা সৈনিক মমতাজ বেগম। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে নির্যাতিত, ত্যাগী নারী মমতাজ বেগম। ভাষার জন্য এই নারী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কারাবরণ করেছেন, স্বামীকে হারিয়েছেন, শিকার হয়েছেন জেল নির্যাতনের তবুও আপোস করেননি তিনি। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের মর্গ্যান গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

মমতাজ বেগম ১৯২৩ সালে ভারতের ভূপাল রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম কল্যাণী রায় চৌধুরী, ডাক নাম মিনু। কলকাতার জজ রায় বাহাদুর মহিম চন্দ্র রায় চৌধুরী (পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক) এর একমাত্র কন্যা ছিল কল্যাণী রায় চৌধুরী। কল্যাণীর পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজশাহীর রঘুন্দনপুরের জমিদার। মা বাংলা সাহিত্যে অন্যতম পথিকৃৎ প্রমথনাথ বিশীর বোন স্কুল শিক্ষিকা মাখন মতি দেবী। মামা প্রমথনাথ বিশীর সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা কল্যাণী রায় চৌধুরী রক্ষণশীলতার শিকল ভেঙে ভালোবেসে ফেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র গোপালগঞ্জের আবদুল মান্নাফকে।

কল্যানী ছিলেন হিন্দু আর মান্নাফ মুসলিম! সব কিছু ফেলে ১৯৪৬ সালে পালিয়ে এলেন কল্যাণী রায় চৌধুরী। ধর্মান্তরের পর নাম হল মমতাজ বেগম। তিনি ১৯৪৩ সালে কলকাতা থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪২ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএড এবং ১৯৬৪ সালে এমএড ডিগ্রি লাভ করেন।

হাওড়া থেকে চলে এলেন গোয়ালন্দে, সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ। এর মধ্যে কোল জুড়ে এসেছে একটি শিশুকন্যা, নাম রেখেছেন খুকু। মর্গ্যান গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। এরপরে এলো ১৯৫২। ঢাকার একদম কাছে নারায়ণগঞ্জেও ভাষা আন্দোলনের আগুন লেগে গেলো সাংঘাতিকভাবেই। চারদিকে তখন বারুদের মত চাপা তারুণ্য ফুঁসে ওঠার অপেক্ষায়।

ঢাকা থেকে খবর এলো ২১ ফেব্রুয়ারিতে মিছিল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা মিছিলে যাবে। নারায়ণগঞ্জের রহমতউল্লা মুসলিম ইন্সটিটিউটের সামনে তখন সভা চলছে। জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। সভা চলাকালীন তারা জানতে পারলেন, ঢাকায় বহু ছাত্র মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেয়েছে। পুরো নারায়ণগঞ্জ তখন তোলপাড়, চারিদিকে উত্তেজিত জনগণ ভাষার দাবিতে শ্লোগান দিচ্ছে। ছাত্রদের উপর পুলিশের বর্বর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মর্গ্যান হাইস্কুলের ৩০০ ছাত্রী নিয়ে পথে বেড়িয়ে এলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম।

চাষাঢ়া মাঠে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে মর্গান স্কুলের ৩০০ ছাত্রী, শিক্ষিকা এবং মহিলাদের একটি বিরাট মিছিল শোভাযাত্রাসহ সভায় এসে যোগ দেয়। করাচি থেকে ‘ইভিনিং টাইমস’ নামে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকায় পরদিন প্রথম পাতায় নারায়ণগঞ্জের সে সভার সংবাদ প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘নুরুল আমীন মাস্ট গো নারায়ণগঞ্জ মিটিং ডিমান্ড’।

নারায়ণগঞ্জের আগুন চাপা দেবার জন্য প্রশাসনের নজর তখন মমতাজ বেগমের দিকে। তারা বুঝে গেছে নারায়ণগঞ্জের আন্দোলন থামাতে হলে মমতাজ বেগমকে থামাতে হবে। ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয় মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করার। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়, বলা হয় স্কুলের তহবিল আত্মসাৎ করেছেন মমতাজ বেগম। ২৯ তারিখ গ্রেফতার করা হল তাকে, তার কন্যাটি তখন চার বছরের। বিভিন্ন মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগে তাকে চাকুরিচ্যুত করা হল। মুহূর্তে সব জায়গায় সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জের সবক’টি স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে মিছিল নিয়ে কোর্ট প্রাঙ্গণে হাজির হয়।

হাজার হাজার মানুষ তখন ঘিরে ফেলেছে নারায়ণগঞ্জ থানা। সকাল নয়টা বাঁজতে বাঁজতে বন্ধ হয়ে গেছে রাস্তাঘাট মানুষের ভিড়ে। মহকুমা পুলিশ অফিসার মানুষের এই স্রোত দেখে উত্তেজনা কমাবার জন্য ঘোষণা দিলেন কোর্ট থেকে তাকে জামিনে ছেড়ে দেয়া হবে।

১০ হাজার টাকা জামিনের আবেদন করলেও জামিন নামঞ্জুর হয়, ঢাকার কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয় বিচারক। ক্ষোভে ফেঁটে পড়লো মানুষ। সারা শহর জুড়ে শুরু হলো মানুষের বিক্ষুব্ধ আলোড়ন। পুলিশের সাধ্য রইলোনা সেই আলোড়ন থামানোর। লোকে লোকারণ্য কোর্ট প্রাঙ্গণ আর নারায়ণগঞ্জের উত্তাল অবস্থা দেখে মহকুমা প্রশাসক ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে ইপিআর পাঠানোর আহ্বান জানান। সংবাদ পেয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের পথে বড় বড় ১৬০টি গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে ছাত্রছাত্রীরা। সরকার নিজেই একজন পুলিশকে খুন করিয়ে আন্দোলনকারিদের বিরুদ্ধে এই হত্যার দায় চাপাল। ট্রাকের পর ট্রাক পুলিশ এসে ঢাকার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হল মমতাজকে।

মমতাজ বেগমকে সরকার ক্ষমাপ্রার্থণা এবং মুচলেকার মাধ্যমে মুক্তির প্রস্তাব দেয়। মমতাজ বেগম তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তার স্বামী ঢাকার খাদ্য পরিদর্শক আবদুল মান্নাফ তাকে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানালে তিনি তাতেও অস্বীকৃতি জানান। স্বামী তখন সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে তালাক দেন মমতাজ বেগমকে।

১৯৫৩ সালের শেষদিকে দেড় বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান মমতাজ বেগম। নারায়ণগঞ্জে ফিরে এলেন না। ঢাকাতেই আনন্দময়ী গার্লস স্কুল ও আহমেদ বাওয়ানী একাডেমীতে শিক্ষকতা শুরু করলেন। প্রচন্ড অর্থকষ্টে আর রোগশোকে ভুগতে লাগলেন, জেলের অত্যাচার তার শরীর মন দুইই ভেঙ্গে দিয়েছে। স্থান হল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ১৯৬৭ সালের ৩০ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন সেখানেই। কন্যা খুকু তখন পশ্চিম পাকিস্তানে, স্বামীর সংসারে। তাকে কবর দেওয়া হলো আজিমপুর কবরস্থানে। কেউ জানলো না কোন কবরটি তার। হারিয়ে গেলেন মমতাজ বেগম কোন চিহ্ন না রেখেই।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মহীয়সী এই নারী ভাষা সৈনিকের সম্মানে মর্গ্যান স্কুলের সামনের সড়কটির নামকরন করেছে ‘ভাষা সৈনিক মমতাজ বেগম সড়ক’।

সব খবর
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বশেষ