শুক্রবার ২৩ অক্টোবর, ২০২০

‘মাতৃত্বকালীন সুবিধা নারী শ্রমিকের বিশেষ অধিকার’

রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২০, ২০:৪০

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

এমএ শাহীন: আমাদের দেশে সকল কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে নারীদের তেমন কোন সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নেই। তারপরও প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে সকল ধরণের কাজকর্ম করছে নারীরা। পোশাক শিল্পে কর্মরত প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিকের ৮০ ভাগ নারী শ্রমিক প্রতিকূল পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছে। নারীরা পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চাকুরি করে একই সাথে গর্ভধারণ করে থাকে। গর্ভধারণের পর তারা অনেক কঠিন প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়। তাই গর্ভবতী শ্রমিকদের এই কঠিন অবস্থার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ শ্রম আইনে তাদের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। দুঃখজনক হলো আমাদের দেশে প্রচলিত শ্রম আইন অনুসারে শ্রমিকদের যতটুকু অধিকার, ছুটিছাটা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে তা অধিকাংশ কারখানায় দেয়া হয় না। মালিক কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সাথে সবসময় অশালীন ও অভদ্র আচরণ করে থাকে। এমনকি নারী শ্রমিকরা কখনো কখনো যৌন হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হয়। কোন প্রকার ছুটি বা সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে কথা বলত গেলেই চাকুরি থাকে না। এই পরিস্থিতিতে মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা ভোগ করা নারী শ্রমিকের জন্য খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে প্রত্যেক নারী শ্রমিকের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ও প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা একটা বিশেষ অধিকার। কোন নারী শ্রমিক সন্তান প্রসবের পূর্বে অন্তত ৬ মাস কোন কারখানায় কাজ করলে মজুরিসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করতে পারবে। সন্তান প্রসবের পূর্বে ৮ সপ্তাহ এবং সন্তান প্রসবের পরে ৮ সপ্তাহ মোট ১৬ সপ্তাহ সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করবে। তবে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী কোন নারী শ্রমিকের সন্তান প্রসবের সময় যদি দুই বা ততোধিক সন্তান জীবিত থাকে তাহলে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাবে না। সে ক্ষেত্রে অন্যান্য ছুটি পাইবার অধিকারী হলে তা তিনি অবশ্যই পাবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকেরা নিয়ম অনুসারে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হলেও মালিকরা তা দেয় না। নানা কৌশলে তাদেরকে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। কিছু সংখ্যক কমপ্লায়েন্স কারখানায় মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আর্থিক সুবিধা দেয়া হলেও সে ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। শ্রম আইনের ধারা ৪৫ (৩) অনুযায়ী মালিক যদি জানে যে, দশ সপ্তাহের মধ্যে কোন নারী শ্রমিকের সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা আছে কিংবা কোন নারী শ্রমিক পূর্ববর্তী দশ সপ্তাহের মধ্যে সন্তান প্রসব করেছে তবে মালিক সে সময় উক্ত নারী শ্রমিককে দিয়ে এমন কোন কাজ করতে পারবে না যা তার জন্য দুষ্কর বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অথবা স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অধিকাংশ পোশাক কারখানায় এসব নিয়ম-কানুন মানা হয় না। শ্রম আইন লঙ্ঘন করে কাজ করানো হয়। শ্রম আইনের ৩৩২ ধারা অনুযায়ী কোন প্রতিষ্ঠানে কোন কাজে কোন নারী নিযুক্ত থাকলে তিনি যে পদমর্যাদারই হোক না কেন তার সাথে সেই প্রতিষ্ঠানের অন্য কেউ এমন কোন আচরণ করতে পারবে না যা অশালীন কিংবা অভদ্র বলে গণ্য হতে পারে অথবা উক্ত নারীর শালীনতা এবং সম্ভ্রমের পরিপন্থী। কোন ব্যক্তি এ বিধান না মানলে তিনি অপরাধী গণ্য হবে, তার দায়ে তিনি শ্রম আইনের ৩০৭ ধারা অনুযায়ী পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদ-ে দন্ডিত হবে। দুঃখের বিষয় হলো আইন থাকলেও প্রয়োগ না থাকার কারণে প্রতিনিয়ত কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের সাথে মালিক কর্তৃপক্ষ অশোভন আচরণ করে থাকে। কোন নারী শ্রমিক গর্ভবতী হলে সেই বিষয়টি কারখানা কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তারা তাকে চাকুরি থেকে অব্যাহতি দিতে বলে। গর্ভবতী নারী শ্রমিক রাজি না হলে কর্তৃপক্ষ তাকে ভয়ভিতি দেখিয়ে জোরপূর্বক সাদা কাগজে সাক্ষর রেখে কারখানা থেকে বের করে দেয়। এসব বিষয় নিয়ে কোন ঝামেলা করলে জুট সন্ত্রাসী দিয়ে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেয়া হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে মাতৃত্বকালীন সুবিধা বঞ্চিত নারী শ্রমিকরা আইনি সহায়তা নিতে সাহস পায়না।

নারায়ণগঞ্জ শহরের রাসেল গার্মেন্টসের ৫ জন নারী শ্রমিক (১) রোকসানা বেগম (২) সাথী আক্তার (৩) জান্নাতুল (৪) নাসিমা আক্তার (৫) শারমিন আক্তার বলেন কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে ছিল। তারা বিষয়টি ‘গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’ নামক শ্রমিক সংগঠনকে অবহিত করলে সংগঠনটি শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে কলকারখানা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় কারখানার মালিককে চাপ দিয়ে তাদের মাতৃত্বকালীন আর্থিক সুবিধা আদায় করে দিয়েছে। এদের অভিযোগ এই কারখানায় আরো অনেক শ্রমিককে মাতৃত্বকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পাঠানটুলী এলাকার রুপসী গার্মেন্টসের নারী শ্রমিক মুক্তা বেগম বলেন, তাকে কারখানা কর্তৃপক্ষ মাতৃত্বকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে ফলে অধিকার আদায়ের জন্য সে শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেছে তা চলমান আছে। এমন অনেক ঘটনা আছে কিন্তু সব ঘটনা সামনে আসে না। কারণ সুবিধা বঞ্চিত অনেক শ্রমিক হয়রানির শিকার হয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে চুপ হয়ে যায়। তারা মনে করে এসব সুবিধা ভোগ করা ভাগ্যের ব্যাপার। এটা যে তাদের বিশেষ অধিকার তা অনেক শ্রমিক জানেওনা আর জানলেও ভোগ করতে পারে না। নারী শ্রমিকের সুযোগ সুবিধা ও নারী সহায়ক নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে গার্মেন্ট শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। এই বিবেচনা থেকে কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের সাথে অশোভন ও সম্মানজনক আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারখানার মালিক কর্তৃপক্ষকে সংবেদনশীল হয়ে শ্রমিকদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। সুবিধা বঞ্চিত নারী শ্রমিকের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সরকারি সংস্থা শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে। শিল্পের অগ্রগতি ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের উপযুক্ত সম্মান, সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে, শিল্পের উৎপাদন বাড়বে, শিল্প বিকশিত হবে। এতে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে দেশ এগিয়ে যাবে।

লেখক: সভাপতি, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ জেলা

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ