সোমবার ২৩ মে, ২০২২

মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার বিতর্ক

বুধবার, ৩০ মার্চ ২০২২, ১২:৪১

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

রফিউর রাব্বি: মুক্তিযোদ্ধা সনদধারি সকলেই এক কাতারের মুক্তিযোদ্ধা নন। যাঁরা যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়েছেন, যাঁরা যুদ্ধ করে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, যাঁরা যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন এবং যাঁরা ১৬ ডিসেম্বরের কদিন আগে ক্যাম্পে গিয়ে কেবল নাম লিখিয়েছেন- তাঁরা সকলেই এক কাতারের মুক্তিযোদ্ধা নন, হতে পারেন না।

১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দেশের জনগণ বুঝতে পারে যে, দেশ শত্রুমুক্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তখন অনেক তরুণ-যুবক মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখাতে থাকেন। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর বিজয়ের মাত্র দু-তিন দিন আগে দলে দেলে মানুষ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গিয়ে নাম লিখিয়ে নেন। দেশ স্বাধীন হলে তখন তাঁদেরকে ১৬ নম্বর মুক্তিযোদ্ধা বলা হতো। তাঁরা সকলেই এক কাতারের মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন না।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় ১৯৭১ সালে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষকের সন্তান। যাঁদের অধিকাংশের মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেই। তাঁরা সনদ নেন নি, সরকারের কোন রকম সুযোগ-সুবিধা তাঁরা গ্রহণ করেন নি। তাঁদের অনেকে দারিদ্র নিয়ে জীবনযুদ্ধে কারো সাথে আপস না করে মৃত্যু বরণ করেছেন, কেউবা রিক্সা চালিয়েছেন, কেউ ভিক্ষুক হয়েছেন। এমন নজির আমাদের সামনে অসংখ্য রয়েছে। অন্যদিকে শহরের মধ্যবিত্ত তরুণ যুবক যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সনদটি মূলত তাঁদের দখলে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এই শ্রেণি চরিত্রটি বোঝা স্বাধীন বাংলাদেশর অসঙ্গতি বুঝতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা দেখেছি স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি খুদ্র অংশ কি ভাবে নৈতিক-স্খলনে নিমজ্জিত হয়েছেন। তাঁরা ব্যাংক-বিমা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, চাঁদাবাজি, প্রতিপক্ষকে যেন-তেন হত্যা সহ বিভিন্ন অরাজক কর্মকা-ের মাধ্যমে গোটা মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। যার দায়ভার তখন সরকারের উপর গিয়ে চেপেছে। সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশের মানুষ অস্বস্থিতে পড়েছেন। তাঁদের এই কর্মকা- পঁচাত্তরের ভয়াবহ পটভূমি তৈরীতে সহায়তা করেছে। পরে এদেরই কেউ কেউ স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে আশ্রয় নিয়ে বিত্তবৈভবের পাহাড় গড়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দখলে নিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছেন।

আমাদের নারায়ণগঞ্জে এই চাঁদাবাজি-লুটপাট যিনি থামাতে পাতেন, তিনি তা করেন নি। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একে প্রশ্রয় দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জে তখন একটা কথা চাউর ছিল, তা হচ্ছে “থার্টি পার্সেন্ট”। এই থার্টি পার্সেন্ট সকল অপকর্মকে বৈধতা দিত। এইটি খুব বেশি আগের কথা নয়। নারায়ণগঞ্জে এখনো হাজার হাজার মানুষ বেঁচে আছেন যাঁরা তা দেখেছেন, প্রত্যক্ষ করেছেন, যাঁরা সে বিভীষিকাময় সময়ের উজ্জ্বল-সাক্ষী।

এ সব প্রশ্ন আজকে নতুন করে সামনে আসছে এই জন্যে যে, নারায়ণগঞ্জে একজন প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতা বিরোধীকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বানানোর নির্লজ্জ তৎপরতা শুরু হয়েছে। তাও আবার মুক্তিযোদ্ধা নামীয় কিছু ব্যক্তি-বর্গের দ্বারা। তাঁদের কর্মকা-ে চিন্তাবিদ আহমদ ছফার একটি কথা স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছেন, “১৯৭১ সালে যারা রাজাকার ছিলেন, তারা আমৃত্যু রাজাকার, কিন্তু যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা তাঁরা আমৃত্যু মুক্তিযোদ্ধা নন। দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে বারে বারে পরীক্ষা দিয়ে তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা থাকতে হয়।”

কে রাজাকার, কে মুক্তিযোদ্ধা তার প্রমাণ কি ভাবে হবে? কোন মুক্তিযোদ্ধাতো ননই, কোন সরকারও তথ্য-প্রমাণ ছাড়া তা নির্ধারণ করার অধিকার রাখে না। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন এমএজি ওসমানী। যুদ্ধ শেষে যাঁর স্বাক্ষরে মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেয়া হতো। তিনি বললেওতো তা ইতিহাস বা সত্য হয়ে যাবে না; যদিনা তার পক্ষে যথেষ্ট দালিলিক প্রমাণ থাকে।

ইাতহাস তৈরীর স্বীকৃত পথ রয়েছে, পদ্ধতি রয়েছে। ইতিহাসের মূল আকর ও ভিত্তি হচ্ছে সে সময়ের সংবাদপত্র ও নথিপত্র। সে সময়ের ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত ব্যক্তির সাক্ষৎকার বা সাক্ষ ইতিহাসের দুর্বল উপাদান। কারণ দেখাগেছে যাঁরাই ঘটনার বর্ণনা করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই নিজেকে নায়ক বা মহানায়ক বানাতে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অসত্য ও অসংখ্য ভুলের আশ্রয় নিয়ে ইতিহাসকে চোরাবালিতে নিক্ষিপ্ত করেছেন। আর সেজন্যই কোন এক বা একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য ইতিহাস হয়ে ওঠে না। তবে এ ক্ষেত্রে সাক্ষ্য দেয়া ব্যক্তির সততা, নিষ্ঠা, আদর্শ ও দৃঢ়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এমনি বহু ব্যক্তির নাম আমরা শুনি যাঁরা প্রকৃত ভাবে তা নন। আর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়তো অসঙ্গতির শেষ নেই। আমরা দেখলাম একাত্তরে যার বয়স ছয় মাস মুক্তিযোদ্ধা সনদ যেমনি তার কাছে, আবার স্বাধীনতা বিরোধীদের কাছেও অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সনদ। অর্থের বিনিময়ে সনদ বাগিয়ে নেয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও মাসিক ভাতা দিচ্ছে। আর তাই সনদ নিয়ে এমনি অনৈতিক তৎপরতা। কিন্তু কথা হচ্ছে সরকার যে ভাতাটা দিচ্ছে সে টাকাটাতো জনগণের টাকা। আর তাই দেশের প্রতিটি মানুষের জানার অধিকার রয়েছে, টাকাটা যাঁকে দেয়া হচ্ছে সে কতটা মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্তব্য হওয়া উচিৎ যাঁদেরকে ভাতা দেয়া হচ্ছে তাঁদের প্রত্যেকের মুক্তিযুদ্ধকালীন তথ্য সংগ্রহ করা। কে, কোথায়, কখন, কী ভাবে, কী নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তা আর্কাইভ করে সংগ্রহ করা। তা হলে ভবিস্যৎ প্রজন্ম একটি স্বচ্ছ ইতিহাসের উত্তরাধিকার হবে। শহিদদের তালিকা তৈরী, রাজাকারদের তালিকা তৈরী- এ সব কাজ মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছরে শুরুই হয় নাই। এ সবে অনিহার কারণ হতে পারে যে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বা তাদের বংশধরদের অনেককে শাসকগোষ্ঠীর অনেকে আত্মিয় বানিয়েছেন, দলে নিয়েছেন, সাংসদ বানিয়েছেন। এখন আর তাদের বিব্রত করতে চান না। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যেমনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজকে নিজেদের দায়িত্বই মনে করে না, তেমনি দেশের মুক্তিযোদ্ধা সংসদগুলোও তাই।

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু যখন কোন মুক্তিযোদ্ধা সামান্য অর্থের লোভে নিজের মস্তক, বিবেক ও আদর্শ বিক্রি করে দেন তখন তিনি মুক্তিযোদ্ধা থাকেন কি করে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম এবার স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণকরা সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্যের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা সাংসদকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘আপনার বাবা রাজাকার ছিলেন, চাচা রাজাকার ছিলেন।’ সাংসদের মুখে কোন কথা নেই, টু-শব্দ টি নেই। আমরা সেলুট জানাই সে মুক্তিযোদ্ধাকে, যিনি এখনো সিনা টান করে, মেরুদ- সোজা রেখে আদর্শকে আঁকরে আছেন। এরাই মুক্তিযোদ্ধা। যাঁরা কখনো আদর্শ বিক্রি করেন না। নির্ভয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। যাঁরা জীবন বাজি রেখে শক্তিশালি পাকবাহিনীকে দেশ থেকে তাড়াতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁদের মাথা বিক্রি মেনে নেয়া যায় না।

নারায়ণগঞ্জে স্বাধীনতা বিরোধী যে ব্যক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বানাতে কতিপয় সুবিধাভোগী আজকে মরিয়া, তাদের মনে রাখতে হবে এখানে মাথা বিক্রি না করা অসংখ্য মানুষ এখনো জীবিত আছেন। হাজার হাজার মানুষ এখনো বেঁচে আছেন যাঁরা একাত্তর দেখেছেন, কে কি ভাবে সমাজপতি হলেন, সম্পদের পাহাড় তৈরী করলেন তা দেখেছেন, তারা তা জানেন। সুতরাং টাকা বা বিত্তবৈভবের দাপটে ইতিহাস নিজেদের পক্ষে নেবেন বলে যারা ভাবেন- তারা ভুল করছেন। তা কস্মিনকালে সম্ভব হবে না। সরকার ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে কখনোই ইতিহাস বদলে দেয়া যাবে না, তা কখনো হয় না। ইতিহাস বিকৃতকারী সব সময় নিজেই ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হন। এটাই ইতিহাসের সত্য।

সব খবর