মঙ্গলবার ০৯ মার্চ, ২০২১

হকার নিয়ে সংঘর্ষের ৩ বছর, যা ঘটেছিল (ভিডিওসহ)

শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২:৩৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতে হকারকে কেন্দ্র করে নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও এমপি শামীম ওসমান সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের তিন বছর আজ। যে ঘটনা সারা বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। আজও এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে আলোচনা। নারায়ণগঞ্জ শহরে নাগরিক ভোগান্তির অন্যতম কারণ হকার। শহরের ফুটপাতজুড়ে হকারের দৌরাত্মে ব্যাহত নাগরিক জীবন। শহরে যানজট দূর ও হকার উচ্ছেদের দাবি নারায়ণগঞ্জবাসীর বহুদিনের। অসংখ্যবার বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত থেকে সিটি কর্পোরেশন হকার উচ্ছেদ করে। কিন্তু এই হকার সমস্যার সমাধান মিলেনি আজও। হকারকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে ঘটেছিল রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষের মতো ঘটনা। ওই ঘটনায় আহত হন নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সহ শতাধিক। তবে এ ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও হকার সমস্যার সমাধান হয়নি।

যেখান থেকে শুরু
২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর খ্রিস্টান ধর্মলম্বীদের পবিত্র বড় দিন উপলক্ষে শহরের সাধু পৌলের গীর্জার সামনের ফুটপাত খালি রাখতে পূর্ব থেকেই তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন মোস্তাফিজুর রহমান দফায় দফায় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিন শাহ পারভেজকে নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্দেশ দেয়ার পরও সকালে গির্জায় প্রবেশকালে হকারদের দখলের বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা না নেয়ার কারণ জানতে চান। একপর্যায়ে তাৎক্ষনিক ক্লোজ করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয় তাকে। এরপরই শহরের ফুটপাতগুলো থেকে হকার উচ্ছেদে কঠোর মাঠে নামে পুলিশ।

সংঘর্ষের আগে সংলাপ
উচ্ছেদের ৩দিন পর ফুটপাতে বসার জন্য ২৮ ডিসেম্বর হকাররা ডিসি ও এসপিকে স্মারকলিপি দেন। ডিসি ও এসপি হকার নেতাদের জানান, তাদের একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসন এক সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে নেয় সিদ্ধান্ত হকারদের জানানো হবে। এ কথার পর হকাররা ফিরে আসেন।

পরে ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানের সাথে দেখা করেন হকার নেতারা। এ সময় হকারদের উদ্দেশ্যে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেন, উচ্ছেদ যখন পুলিশ করেছে তাঁর (আইভী) প্রেশারেই করছে। এই সমস্যার সমাধান আমার কাছে নাই। আমি আপনাদের মিথ্যা আশ্বাস দিবো না। এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। আমার বিশ্বাস তিনি সমাধান করবেন। তিনি না করলে আমি দেখবো।

এদিকে হকাররা ফুটপাতে বসার জন্য আন্দোলন করতে থাকে। ৩০ ডিসেম্বর বিকালে শহীদ মিনারে হকারদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার। এছাড়া হকারদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান।

৩১ ডিসেম্বর স্মারকলিপি নিয়ে হকাররা যান নগরভবনে মেয়রের কাছে। এসময় মেয়র পরিষ্কার জানিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু সড়কে কোন হকার বসতে দেয়া হবে না। বিকল্প হিসেবে তিনি তাদের হকার্স মার্কেট, হাসপাতাল রোড, জিমখানা মাঠ, ওসমানী স্টেডিয়াম এবং নগরভবনের সামনের সড়কে বসার প্রস্তাব দেন। এছাড়া পুনর্বাসনের জন্য সবার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিবেন বলেও জানান। কিন্তু নাসিকের সকল বিকল্প প্রস্তাব আমলে না নিয়ে বঙ্গবন্ধু সড়কে বিকাল ৫টা থেকে বসার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায় হকাররা। এক পর্যায়ে ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি আবারো তারা জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হয়। তখন জেলা প্রশাসক তাদের বলেন, আপনাদের যেমন আমার দেখতে হবে তেমনি নগরবাসীর কথাও ভাবতে হবে। অনেকটা মেয়রের কথার সাথে সুর মিলিয়ে ডিসি বলেন, আপনাদের ভোটার আইডিকার্ড অথবা জন্মনিবন্ধন, চেয়ারম্যান সার্টিফিকেটসহ তালিকা জমা দেন। আমরা দেখবো কি করা যায়। কিন্তু হকাররা পুর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দিতে ব্যর্থ হয়।

পরে ১৩ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনের এমপি সেলিম ওসমান আলোচনার জন্য হকারদের রাইফেলস ক্লাবে ডাকেন। সেখানে সেলিম ওসমান হকারদের বলেন, ফুটপাতের বিকল্প শহীদ জিয়া হল চত্বর ও জামতলা ঈদগাহ মাঠে রোববার (১৪ জানুয়ারি) থেকে আপনারা শীতের কাপড় বিক্রি করবেন। এসময় সেলিম ওসমানও হকারদের তালিকা জমা দিতে বলেন। কিন্তু সেলিম ওসমানের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে হকাররা বলেন, আমরা বিকেল ৫টার পর বঙ্গবন্ধু সড়ককেই বসতে চাই। তখন সেলিম ওসমান বলেন ওটা আমার হাতে নেই। আমি আপনাদের জন্য সুপারিশ করে সিটি কর্পোরেশনে চিঠি দিতে পারি। সিটি কর্পোরেশন সিদ্ধান্ত দেবে। ওই দিন সন্ধ্যায় সেলিম ওসমান হকারদের পক্ষে একটি প্রস্তাবনা সুপারিশ আকারে (চিঠি) নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বরাবর পাঠান। পরদিন ১৪ জানুয়ারি রোববার সকালে ওই চিঠি মেয়রের হস্তগত হয়।

সেলিম ওসমান তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, শহরে বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিবেশ শান্ত করা এবং হকারদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ জানুয়ারী বিকেল ৪টায় আমি নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবে তাদের সাথে আলোচনা করি। উক্ত আলোচনায় উপস্থিত কয়েক হাজার হকার বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ফুটপাতে দোকান বসানোর জন্য আমার কাছে জোরালো দাবি রাখে। সেই সাথে তারা জনগণের চলাচলে কোন প্রকার বিঘœ না ঘটিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করবে বলে ওয়াদা দিয়েছে। আমি তাদেরকে সরাসরি কোন প্রকার আশ্বাস না দিয়ে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের বর্তমান দূরাবস্থার কথা মানবিক বিবেচনায় তাদের প্রস্তাবিত দাবি বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান বসানোর বিষয়টি সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি সাপেক্ষে আমার অনাপত্তির কথা জানাই, তবে তা অস্থায়ী হিসেবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তারিখ সময় পর্যন্ত।

সেলিম ওসমানের চিঠির জবাবে সিটি কর্পোরেশন তার কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, আপনার মানবিক উদ্যোগের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ওসমানী পৌর স্টেডিয়ামের বর্ধিতাংশ, জামতলার ঈদগাহ মাঠ, নগর ভবনের সম্মুখের অংশ ও নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের পেছনে রাজউকের কার পার্কিংয়ের জায়গায় প্রতিদিন বিকেল ৫টা হতে রাত ৯টা পর্যন্ত হকার বসানোর বিষয়ে নির্দেশক্রমে সম্মতি জ্ঞাপন করা হলো।

পাল্টাপাল্টি অবস্থানে শামীম-আইভী
এদিকে ১৪ জানুয়ারি হকাররা বলেন, আমরা বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির দ্বারস্থ হয়েছি। এবার আমরা আমাদের গরীবের নেতা এবং গরীবের বন্ধু মাননীয় এমপি শামীম ওসমানের কাছে যাবো। তিনি আমাদের একটা ব্যবস্থা করবেন। এরপর ১৫ ডিসেম্বর বিকাল ৪টায় শহরের চাষাড়া পৌর মার্কেটের সামনে সমাবেশের আয়োজন করে হকাররা। সমাবেশে উপস্থিত হন এমপি শামীম ওসমান। তিনি সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে আলোচনা ছাড়াই শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসার নির্দেশ দেন। সমাবেশে সিপিবির জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলামকে পাশে রেখে শামীম ওসমান হাতের ঘড়ি দেখে বলেন, এখন বাজে সাড়ে চারটা। আমার প্রিয় হকার ভাইদের বলছি, আগামীকাল মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে নারায়ণগঞ্জে আবার হকার বসবে। এটা কোন অনুরোধ নয়, সুপারিশ নয়, এটা এমপি শামীম ওসমানের নির্দেশ। কোন প্রশাসন অথবা কেউ যদি আমার এই হকার ভাই-বোনদের গায়ে হাত দেয় সেটা আমি শামীম ওসমান দেখবো। তিনি আরও বলেন, কোন বিকল্প ব্যবস্থা না দিয়া যদি কেউ মনে করেন নারায়ণগঞ্জে হকার উঠাইয়া দিবেন, পারবেন। অবশ্যই পারবেন। শামীম ওসমানের মৃত্যুর পর, তার আগে পারবেন না। আমি আমার নেতাকর্মী যারা আছেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নির্দেশ দিয়া দিলাম, যদি কোন মাস্তান, কোন ব্যক্তি হকারদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে আসে তাদের প্রতিরোধ করবেন। বাকিটা আমি দেখবো।

শামীম ওসমানের এই ঘোষনার প্রতিক্রিয়ায় ওই রাতেই নাসিক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী গনমাধ্যমে বলেন, নারায়ণগঞ্জ শহর শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকায় নয়। এটা ৫ আসনের এলাকা। যেহেতু এই আসনের এমপি একটি প্রস্তবনা দিয়ে দেশের বাহিরে গিয়েছেন সেখানে অন্য আসনের এমপি হকারদের এভাবে উস্কানি দিয়ে কাজটা ভালো করলো না।

ডেটলাইন ১৬ জানুয়ারি
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্রমতে, পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ী দুপুরের পর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে অবস্থান নিতে শুরু করে এমপি শামীম ওসমানের সমর্থকরা। বেলা ৪টা দিকে নিয়াজুল ইসলাম খান, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. জুয়েল হোসেন, জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাফায়েত আলম সানি, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন, সাবেক জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এহসানুল হক নিপু, মহানগর ছাত্রলীগের তৎকালীন যুগ্ম আহবায়ক হাসনাত রহমান বিন্দু, নাসিকের ২৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল, জেলা কৃষকলীগের যুগ্ম আহবায়ক জিল্লুর রহমান লিটন, যুবলীগ নেতা জানে আলম বিপ্লব ও চঞ্চল মাহমুদের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও হকারদের জড়ো হতে দেখা যায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে।

অন্যদিকে নগরভবন থেকে বিকাল ৪টার পর নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার সাথে ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাশেদ রাশু, মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম, সাধারণ সম্পাদক শরীফুদ্দিন সবুজ, জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল কাদির, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান, মহানগর যুবলীগের সভাপতি আহাম্মদ আলী রেজা উজ্জল, নাসিক ১৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরন বিশ্বাস, ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খোরশেদ, বিএনপি নেতা সরকার আলম, ১৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসেন, ২১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হান্নান সরকার, ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতান আহমেদ, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর (২২, ২৩, ২৪) শাওন অঙ্কন, নারায়ণগঞ্জ সাংষ্কৃতিক জোটের তৎকালীন সভাপতি জিয়াউল ইসলাম কাজল, সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল, ওয়ার্কার্স পাটির জেলা সেক্রেটারী হিমাংশু সাহা, ন্যাপের জেলা সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন, খেলাঘরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জহিরুল ইসলাম জহির, জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য শহীদুল্লাহ, যুবলীগ নেতা কামরুল হুদা বাবুসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক।

এদিকে আইভীর উপস্থিতি টের পেয়েও বিক্ষিপ্ত কিছু হকার ফুটপাতে বসে থাকে। এ সময় আইভীর সাথে থাকা লোকজন নূর মসজিদের বিপরীতে পেট্টোল পাম্প সংলগ্ন বসে থাকা হকারদের উঠিয়ে দেয়। এতে কিছুটা হৈ চৈ শুরু হয়। এরপর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আইভী নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের বিপরীতে মুক্তি জেনারেল হাসপাতালের কাছাকাছি পৌছান। সেখানেও দু-তিনজন হকারকে উঠিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় তুমুল হট্টগোল।

এক পর্যায়ে মুক্তি জেনারেল হাসপাতালের সামনে যেতেই নিয়াজুল ইসলাম আইভীর দিকে এগুতে থাকে। এ সময় পূর্ব পরিচয়ের সূত্রধরে আইভীর সাথে থাকা সুফিয়ান ও আব্দুল কাদির নিয়াজুলকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু নিয়াজুল পিছু না হটে আইভীর দিকেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে অনেকটা ধাক্কা দিতে দিতে নিয়াজুলকে চাষাড়ার দিকে নিয়ে যেতে চাইলে একসময় নিয়াজুল পড়ে যায়। ওই সময়ে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায় নিয়াজুলকে উঠিয়ে দেয়ার পরই নিয়াজুল কোমর থেকে অস্ত্র বের করে। অস্ত্রের ভয় উপেক্ষা করে আবারো ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় নিয়াজুলকে। কিন্তু নিয়াজুল এবারও যেতে চায়নি। বরং অস্ত্র হাতে মেয়রের দিকেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে টুপি পড়া একজনের ধাক্কায় জামান টাওয়ারের সামনে পড়ে যায় নিয়াজুল। শুরু হয় গণপিটুনী। এই ঘটনার পর চাষাড়া থেকে আইভীর বহরে হামলা শুরু হয়। পাল্টা হামলায় উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এরপর শুরু হয় দফায় দফায় ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ। শামীম ওসমানের লোকজনের সাথে যোগ দেয় উচ্ছেদ হওয়া হকাররা। হামলা থেকে রক্ষা করতে আইভীর লোকজন মানবঢাল তৈরি করে চারদিক থেকে ঘিরে রাখে আইভীকে। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের কারণে মানবঢালের লোকজন বেশি আহত হয়। আইভী নিজেও ইটের আঘাতে আহত হয়ে সড়কে বসে পড়েন। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে ঘন্টাব্যাপী। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন অস্ত্র প্রদর্শন করে। প্রায় ঘন্টাব্যাপি সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রনে চলে যায়।
এ সময় পুলিশ ৯৯টি শটগানের গুলি ও দুটি কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তবে পুরো সংঘর্ষের সময় মেয়র আইভী সায়েম প্লাজার সামনে থেকে নড়েননি। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকসহ শতাধিক আহত হয়। আহতদের নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও ৩০০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুরো শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। হকারদের শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সেলিম ওসমানের পক্ষেও শহরে মাইকিং করা হয়। এই ঘটনায় মেয়র ৫দিন ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

পরস্পরকে দোষারোপ
সংঘর্ষের পরপরই নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আইভী বলেন, ‘আমি ৪টার সময় সিটি কর্পোরেশনের সামনে থেকে সাধারণ লোকদের নিয়ে বের হয়ে আসি। আজকে বের হওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এবং আমাদের কাজের ব্যাপারে প্রেস ক্লাবের সামনে এসে নগরবাসীকে জানাবো। আমরা ফুটপাত দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে হেটে আসছিলাম নগরবাসীকে বলতে আমাদের কার্যক্রমের কথা। কোন বিশৃঙ্খলা তখন হয় নাই। চাষাড়া ফুটপাত দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমি সায়েম প্লাজার সামনে আসি। ওইখানে আমার দাঁড়ানো মাত্র, বড় বড় ইট নিয়ে এবং পিস্তল উচিয়ে হামলা করা হয়।’

সংঘর্ষের ঘটনায় এমপি শামীম ওসমানকে দায়ী করে মেয়র আইভী বলেন, ‘হঠাৎ করে কেন শামীম ওসমান রাইফেল ক্লাবে বসে থেকে এই আক্রমণটা করলো। এই ১৪ বছরে কেউ কোনদিন এইভাবে আক্রমনের সাহস পায়নি। শামীম ওসমান কিসের বলে, কোন প্রশাসনের ইঙ্গিতে, কার ইঙ্গিতে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের উপর, আমার উপর আক্রমণ করলেন। উনি কিসের আক্রোশে আক্রমন করলেন? ২০১১ তার ভরাডুবি হয়েছিল এই জন্যে?’

পরদিন ১৭ জানুয়ারি বিকেলে রাইফেলস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমান বলেন, ‘প্রথম দিকে হকারদের দায়িত্ব নিয়েছিল বাম মোর্চা। বাম মোর্চার মনজুরুল আহসান খান জাতীয় পর্যায়ের নেতা এসে হকারদের পাশে এসে দাঁড়ায়। আমি এদেরকে পার্মান্যান্টলি বসার জন্য বলি নাই। আমি বলেছি পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত তাদের বসতে দিন। এদের কিছু সময় দিন। এরা এদের ঋনের টাকা উঠিয়ে আনুক। একথা বলাতে উনি আমার ছেলের বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। এতে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। উনি আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে আঘাত করলেন।’

শামীম ওসমান আরও বলেন, ‘প্রেস ক্লাবের সভাপতিসহ আরো সহযোগীরা মিলে প্রথমে পাট সমিতির সামনে হকারদের উঠিয়ে দিলেন। তারপর দ্বিতীয় দফা নূর মসজিদের সামনে এসে ওখানেও মার খেয়েছে। আমার কাছে ছবি আছে তারা হকারকে উচ্ছেদ করে তাদের মালামাল পুড়িয়ে দিচ্ছেন। সেখানে আমি দেখলাম আইভীর সাথে কারা ছিলেন, দেখলাম যুব দলের অহ্বায়ক খোরশেদ। তার সাথে কে ছিলেন এই সুমন, বিভা যার স্বামী এবং বড় ভাই মার্ডার কেসের আসামি। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে আইভীর সাথে তাদের ধরা হচ্ছে না। আর মেয়র কথায় কথায় বলেন প্রশাসনকে উৎখাত করা হোক। এই নাটক আমরা সবাই বুঝি।’

পাল্টাপাল্টি মামলা
দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় ওই দিন রাতেই সদর মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

এদিকে এ ঘটনার প্রায় ২২ মাস পর গত ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর আদালতে মেয়র আইভীর পক্ষে মামলা দায়ের করা হয়। মেয়র আইভীকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে নিয়াজুল ইসলাম খান, শাহ্ নিজাম, জাকিরুল আলম হেলাল, শাহাদাত হোসেন সাজনুসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এক হাজার জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন নাসিকের আইন বিষয়ক কর্মকর্তা জিএম সাত্তার।

অন্যদিকে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর প্রায় তিন বছর পর অস্ত্র ছিনতাই ও হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন সেদিন প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনকারি নিয়াজুল ইসলাম খান। মামলায় আসামি করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি অ্যাড. মাহবুবুর রহমান মাসুম, জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান, সিটি কর্পোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস, ১৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসাইন, ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হান্নান সরকার, মহানগর যুবলীগের সহসভাপতি কামরুল হুদা বাবু, সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র আইভীর ছোট ভাই আহাম্মদ আলী রেজা উজ্জ্বল, ২২ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিরুল ইসলাম, যুবদল নেতা সরকার আলমসহ ১৭ জনকে৷

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ