১৬ জুন ২০২৪

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২১:১৩, ৪ মে ২০২৪

নারায়ণগঞ্জে কেবল ‘ওসমান লীগ’ আর ‘ওসমান পার্টি’

নারায়ণগঞ্জে কেবল ‘ওসমান লীগ’ আর ‘ওসমান পার্টি’

জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ একবার নারায়ণগঞ্জের বন্দরে এসে বলেছিলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে কোন দল নেই। নারায়ণগঞ্জে শুধু ওসমান লীগ আর ওসমান পার্টি আছে।’ নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হলে কিংবা ভোটের সময় এলে এরশাদের এই উক্তির যথার্থতা পাওয়া যায়। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এর প্রমাণ পেয়েছিল। বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে আবারও ‘ওসমান লীগ’ আর ‘ওসমান পার্টি’র দেখা মিলেছে।

একদিকে, আওয়ামী লীগ, যে দলটি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে; অন্যদিকে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া জাতীয় পার্টি। এই দুই দলের রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ ভিন্ন হলেও নারায়ণগঞ্জে এই দু’টি ভিন্ন নদী যেন তা এক মোহনায় এসে মিলে যায়। দুই দলের নেতা-কর্মীদের এখানে আলাদা করা যায় না। কেননা, দলের ঊর্ধ্বে তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে ওসমান পরিবার। নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এই দুই দলের উপর। 

আগামী ৮ মার্চ বন্দর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নেই। কোনো দলই তাদের কোনো প্রার্থীকে সরাসরি মনোনীত বলে ঘোষণা করেনি। তবে, ওসমান পরিবারের দুই সংসদ সদস্য চেয়ারম্যান পদে সমর্থন দিচ্ছেন বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ রশীদকে। যদিও, রশীদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থানে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এই পরিবারেরই এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা আতাউর রহমান মুকুল ও মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি মাকসুদ হোসেন।

বন্দর উপজেলা নির্বাচনের কয়েকদিন আগেও মুকুল আর মাকসুদ ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ঘনিষ্ঠদের তালিকায়। সংসদ সদস্যের পছন্দের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়াতেই তালিকা থেকে ছিটকে পড়েন তারা। এমনকি মনোনয়নপত্র দাখিলের পূর্বে মুকুল ও মাকসুদকে বসে যেতেও বলেছিলেন সেলিম ওসমান। তা না করায় নির্বাচনী মাঠে থাকায় ক্ষোভও ঝেরেছেন ওসমান পরিবার ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। নিজে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও দলের নেতাকে পাত্তা না দিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে সেলিম ওসমান আওয়ামী লীগের রশীদকে নিজের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। সংসদ সদস্য সমর্থন দেওয়ায় দলের নেতার পক্ষে কাজ না করে উল্টো জাতীয় পার্টি থেকে মাকসুদকে বহিষ্কারেরও প্রস্তাব দলটির নেতারা।

মাত্র দুই বছর পেছালে দলের বাইরে গিয়ে ওসমান পরিবারের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি নজরে আসে ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময়। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা পান সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীদের গোপন বিরোধীতার পাশাপাশি জোটভুক্ত দল জাতীয় পার্টির নেতাদের প্রকাশ্যে বিরোধিতার সম্মুখীন হন তিনবারের নির্বাচিত সিটি মেয়র আইভী। বন্দরের ওসমান পরিবার ঘনিষ্ঠ ৪ চেয়ারম্যান সরাসরি আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমুর আলম খন্দকারের পক্ষে মাঠে নামেন। একসাথে ৪ চেয়ারম্যান আইভীর বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামলে সেই সময় রাজনীতির মাঠে আলোচনা উঠে আইভীর বিরুদ্ধে তাদের মাঠে নামিয়েছেন ওসমান পরিবার। বিষয়টি ভালভাবে নেয়নি সেই সময় ঢাকা থেকে আসা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি নিয়ে খোঁজখবর রাখা ব্যক্তিরা বলছেন, এখানে জাতীয় পার্টির নেতাদের পোস্টার ফেস্টুনে দলের চেয়ারম্যানের ছবি না থাকলেও ওসমান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত তিনজনের ছবিই থাকে। এখানে দলীয় আদর্শের চেয়েও বড় হয়ে উঠে ওসমান পরিবারের চাওয়া পাওয়া। তাই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রকাশ্যে আইভীর বিরোধিতায় নামেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা আবার উপজেলা নির্বাচনে নিজেদের দলের প্রার্থী মাকসুদ হোসেনকে ছেড়ে ওসমান পরিবার সমর্থিত আওয়ামী লীগ নেতা এম এ রশীদের পক্ষে নির্বাচন করে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। দলীয় আদর্শ ও নেতার থেকেও তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে ওসমান পরিবারের পছন্দ-অপছন্দ।

নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের গোড়াপত্তন করেন নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের দাদা এম ওসমান আলী। তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য। তাঁদের পিতা ওসমান পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্য বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনীতির ময়দানে থাকা একেএম সামসুজ্জোহা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির টিকেটে ৩ বার সংসদ সদস্য হয়েছেন আবার তাঁর ছোট ভাই প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান নৌকা প্রতীকে ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারও আগে এই পরিবারের বড় ছেলে প্রয়াত নাসিম ওসমান স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি সাংসদ হন। পরবর্তীতে ১৯৮৮, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির টিকিটে তিনি এমপি হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বারবার নারায়ণগঞ্জে দলের চেয়ে ব্যক্তি কিংবা পরিবার বড় হয়ে উঠে। এখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে বড় হয়ে উঠে ওসমান পরিবারের প্রতি আনুগত্য। তাই যতক্ষণ কেউ তাঁদের আস্থাভাজন থাকেন তখন তাদের কোন অপকর্ম কিংবা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়না কিন্তু যখনি তাদের বিরুদ্ধাচারন করা হয় তখনি তারা নানা তকমায় বিশেষিত হন। 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়